যেসব কারণ হাদীস দলিল হিসেবে গ্রহনযোগ্য হয় না

**********************************************
অগ্রহণযোগ্য হাদিস মূলতঃ দুই প্রকার-
ক. মাওজু (জাল) হাদিস
খ. যঈফ (দূর্বল) হাদিস।
ক. মাওজু হাদিসঃ মাওজু হাদিস বলা হয় ঐ হাদিসকে যে হাদিসটি রসূলুল্লাহ্ (দ.) এর নামে মিথ্যা ছড়ানো হয়েছে। যেমন- আনাস ইবনে মালিক (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন,
‘‘নাবী (দ.) আমাকে বলেছেন, তুমি সিজদাহ্ হতে তোমরা মাথা উত্তোলনের সময় কুকুরের ন্যায় বসবে না। তোমরা উভয় নিতম্ব (পাছা) দু পায়ের মাঝে রাখবে এবং তোমরা দু পায়ের পিঠ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখবে।’’ -ইবনে মাজাহ্, মাওজু, অধ্যায়ঃ ৫, কিতাবু ইক্বমাতিস্ স্বলাহ্, অনুচ্ছেদঃ ২২, দুই সিজদাহ্’র মাঝে বসা, হাদিস # ৮৯৬।
এই হাদিসটি জাল। কারণ, এই হাদিসের সানাদে ‘আ’লাউ আবু মুহাম্মাদ’ রয়েছে। যার সম্পর্কে ইবনে হিববান ও হাকিম বলেছেন সে আনাস সূত্রে বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করতো। ইমাম বুখারী বলেন, সে হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে পরিত্যাজ্য। ইবনুল মাদানী বলেন, সে হাদিস জাল করতো।
খ. যঈফ হাদিসঃ এই ধরণের হাদিস প্রায় ১১ প্রকার যথাঃ
১. মুরসালঃ যে হাদিসের সনদে ইনক্বিতা (বিচ্ছিন্নতা) শেষের দিকে হয়েছে অর্থাৎ স্বহাবীর নাম বাদ পড়েছে এবং তাবিঈ সরাসরি রসূলুল্লাহ্ (দ.) এর নাম উলেস্নখ করে হাদিস বর্ণনা করেছে, এমন হাদিসকে মুরসাল হাদিস বলে। এ ধরণের হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, তাবিঈর তো রসূলুল্লাহ্ (দ.) থেকে সরাসরি শুনা সম্ভব নয়। আর ঐ তাবিঈ কি স্বহাবী থেকেই শুনেছিলেন না তারই মতো অন্য কোন তাবিঈ থেকে শুনেছেন তা জানা সম্ভব হচ্ছে না। এই কারণে, এই হাদিসটিতে সন্দেহ রয়েছে। সন্দেহ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ বলেন,
‘‘হে ঈমানদারগণ; তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে দূরে থাক…।’’ -সূরা হুজুরাত (৪৯), ১২।
এই আয়াত অনুযায়ী মুরসাল হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন- আবু রুহম সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন,
‘‘রসূলুল্লাহ্ (দ.) বলেছেন, উত্তম সুপারিশ হচ্ছে বিয়ের জন্য দু’জনের সুপারিশ।’’ -ইবনু মাজাহ্, যঈফ, অধ্যায়ঃ ৯, কিতাবুন নিকাহ্, অনুচ্ছেদঃ ৪৯, বিবাহ দেয়ার জন্য সুপারিশ করা, হাদিস # ১৯৭৫।
এই হাদিসটি মুরসাল। সানাদে ‘আবু রহম’ তার নাম হলো ‘আহযাব ইবনু উসাইদ’। ইমাম বুখারী বলেন, তিনি একজন তাবিঈ, তিনি স্বহাবী নন। তাই স্বহাবীর নাম না জানার কারণে উল্লিখিত হাদিসটি গ্রহণযোগ্য নয়।
২. স্মৃতিশক্তি দূর্বলতাঃ যে হাদিসের সানাদে কোনো একজন রাবী তার স্মৃতি শক্তি খুব দূর্বল প্রমাণিত হলে তার বর্ণনাকৃত হাদিসটির প্রতি সন্দেহ থেকে যায়। কারণ বর্ণনাকারী ব্যক্তি আসলেই হাদিসটি মনে রাখতে পেরেছেন কি’না তাতে সন্দেহ থেকে যায়। এই কারণে, এই ধরণের হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ্ বলেন,
‘‘হে ঈমানদারগণ; তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে দূরে থাক…।’’ -সূরা হুজুরাত (৪৯), ১২।
যেমন- আসমা বিনতু ইয়াজিদ হতে বর্ণিত,
‘‘রসূলুল্লাহ্ (দ.) এর জামার হাতা ছিল কব্জি পর্যন্ত।’’ -তিরমিযী, যঈফ, অধ্যায়ঃ ২১, কিতাবুল জিহাদ, অনুচ্ছেদঃ ২৮, জামা প্রসঙ্গে, হাদিস # ১৭৬৫।
হাদিসটি যঈফ কারণ, সানাদে ‘শাহর ইবনু হাউশাব’ রয়েছে। তার স্মৃতি শক্তিতে দূর্বলতা রয়েছে। (তাহযিবুত্ তাহযিব)
৩. মুনকাতিঃ যে হাদিসের সানাদের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি, মাঝখানে কোনো স্তরে কোনো রাবীর নাম বাদ পড়েছে, তাকে মুনকাতি হাদিস বলা হয়। এই ধরণের হাদিসও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, তা আমাদের কাছে সুরক্ষিত হয়ে আসেনি। যেমন-আবু যার (রা.) সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন,
‘‘রসূলুল্লাহ্ (দ.) বলেছেন, আমি এমন একটি বাক্য জানি যা সকল মানুষ যদি গ্রহণ করে তাহলে সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। তারা বললেন, হে রসূলুল্লাহ্ (দ.) সেটা কোন আয়াত? তিনি (দ.) বললেন,
‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ্ তার জন্য পথ সুগম করে দিবেন।’’ -ইবনু মাজাহ্, যঈফ, অধ্যায়ঃ ৩৭, কিতাবুযু যুহ্দ, অনুচ্ছেদঃ ২৪, আল্লাহ্’র ভীতি এবং তাক্বওয়া, হাদিস # ৪২২০।
কারণ সানাদে রাবী ‘আবু সালিল’ স্বহাবী আবু যার (রা.) এর সাক্ষাত পাননি।
৪. মাতরুকঃ যে হাদিসের রাবী সাধারণ কাজ-কর্মে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে বলে খ্যাত, তার বর্ণিত হাদিসকে মাতুরুক বলা হয়। এইরূপ হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ লোকটি সত্যবাদি নয়। সত্যবাদী ছাড়া রসূলুল্লাহ (দ.) সংবাদ গ্রহণযোগ্য হবে না। এই সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-
‘‘হে ঈমানদারগণ; ফাসেকরা যদি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে তা প্রচার করার পূর্বে তা যাচাই করে নাও…’’ -সূরাহ্ হুজরাত (৪৯), ৬।
এই আয়াত অনুযায়ী ফাসেকদের কথা বিশ্বাস করা ঠিক নয়, যতক্ষণ না আমরা তা পরীক্ষা করে নেব। আর মিথ্যাবাদী তো অবশ্যই ফাসেক। তাই যে হাদিসের সানাদে কোন মিথ্যাবাদী থাকবে তার সূত্রে বর্ণিত হাদিস অন্য কোন সত্যবাদী থেকে না শুনা পর্যন্ত বিশ্বাস করা যাবে না। যেমন- ‘‘আবু বুরদা (রাঃ) এর পিতার সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন,
‘‘রসুলূল্লাহ (দ.) বলেছেন, আল্লাহ সকল সৃষ্টিকে এক করবেন, তখন উম্মাতে মুহাম্মদী কে সিজদা করার আদেশ দেয়া হবে। তারা দীর্ঘক্ষণ সেজদারত থাকবে, অতঃপর বলা হবে তোমরা তোমাদের মাথা উত্তোলন কর, আমি তোমাদের সংখ্যা অনুপাতে জাহান্নামে ফিদা’আ করে দিয়েছি।’’ -ইবনু মাজাহ্, যঈফ, অধ্যায়ঃ ৩৭, কিতাবুযু যুহ্দ, অনুচ্ছেদঃ ৩৪, মুহাম্মাদ (দ.) এর উম্মাতের গুণাবলী, হাদিস # ৪২৯১।
কারণ এর সানাদে আব্দুল আ’লা ইবনে আবি মুসাভির রয়েছে। তার সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবনু মাইন বলেছেন, সে মিথ্যুক। ইমাম বুখারী বলেছেন, সে মুনকারুল হাদিস। অতএব হাদিসটির সানাদে মিথ্যাবাদী থাকায় হাদিসটি মাতরুক (পরিত্যাজ্য)।
৫. মাজহুল হওয়া (অজ্ঞাত হওয়া)ঃ যে হাদিসের সানাদে এমন কোন রাবি পাওয়া যায়, যার পরিচয় জানা যায় না। এই ধরণের হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ হাদিসটি কে বর্ণনা করেছে, তার পরিচয় না জানার কারণে বুঝা সম্ভব নয়, ঐ লোকটি কিরূপ ছিল। এ কারণে হাদিসটির প্রতি সন্দেহ থেকে যায়। আর সন্দেহজনিত হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন-
‘‘হে ঈমানদারগণ; তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে দূরে থাক…।’’ -সূরা হুজুরাত (৪৯), ১২।
যেমন- মু’আয (রা.) এর সঙ্গীগণ হতে বর্ণিত আছে,
‘‘রসূলুল্লাহ (দ.) মু’আযকে (রা.) ইয়েমেনে পাঠানোর সময় প্রশ্ন করেন তুমি কিভাবে বিচার করবে ? তিনি (মু’আয (রা.) বললেন, আমি আল্লাহ’র কিতাব অনুযায়ী বিচার করবো। তিনি (দ.) বললেন, যদি আল্লাহ’র কিতাবে না পাওয়া যায় ? তিনি (মু’আয (রা.) বললেন, তাহলে রসূলুল্লাহ (দ.) এর সুন্নাহ (হাদিস) অনুযায়ী বিচার করবো। তিনি (দ.) বললেন, রসূলুল্লাহ (দ.) এর সুন্নাতেও না পাও ? তিনি (মু’আয (রা.) বললেন, আমার জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ (গবেষণা) করবো। তিনি (দ.) বললেন, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ’র যিনি আল্লাহ’র রসূলের প্রতিনিধিকে এরূপ যোগ্যতা দান করেছেন। -তিরমিযি, অধ্যায়ঃ ১৩, কিতাবুল আহ্কাম, অনুচ্ছেদঃ ৩, বিচার কিভাবে ফায়সালা করবে, হা. নং ১৩২৭।
হাদিসটি যঈফ (দূর্বল)। (১) বর্ণনাকারী মু’আয (রা.) এর সাথীগণ মাজহুল, (২) হারেস ইবনুল আমর ‘‘মাজহুল’’ (অপরিচিত) (মিযানুল ই’তিদ্বাল, তাহযিবুত তাহযিব)। এ হাদিস সম্পর্কে ইমাম বুখারী বলেন, হাদিসটি সহিহ্ নয়। ইবনু হাযম বলেন, এ হাদিসটি বাতিল, এর কোনো ভিত্তি নেই (আত্-তালখীস্, পৃষ্ঠাঃ ৪০১)।
৬. মুদাল্লিস্ঃ যে হাদিসের রাবী নিজের প্রকৃত শাইখের (উস্তাদের) নাম উল্লেখ না করে তার উর্ধ্বতন শাইখের নামে এমনভাবে হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, যেন তিনি নিজেই উর্ধ্বতন শাইখের নিকট হাদিসটি শুনেছেন। অথচ তিনি ঐ হাদিসটি ঐ শাইখের থেকে শুনেননি এবং রাবীর দোষ গোপন করেন বর্ণনা করেন, এধরণের হাদিসকে মুদাল্লিস হাদিস বলা হয়। এরূপ করাকে তাদলিস্ বলে, আর যিনি এরূপ করেন তাকে মুদালিস্নস বলে। মুদালিস্নস হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। যে পর্যন্ত না এরূপ জানা যায় যে, তিনি একমাত্র সিকাহ্ (নির্ভরযোগ্য) রাবী থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং রাবীটি গ্রহণযোগ্য। যেমন-আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত,
যাইদ ইবনু হারিসা (রা.) মাদীনায় এলেন। তখন রসূলুল্লাহ্ (দ.) আমার ঘরে ছিলেন। যাইদ (দেখা করার জন্য) তাঁর (দ.) এর কাছে এলেন এবং দরজায় টোকা মারলেন। রসূলুল্লাহ্ (দ.) খালি গায়ে কাপড় টানতে-টানতে তার নিকটে গেলেন। আল্লাহ্’র শপথ আমি তাঁকে (দ.) আগে বা পরে কখনও খালি গায়ে দেখিনি। তারপর তিনি (দ.) যাইদের সাথে কোলা-কুলি করলেন এবং তাঁকে চুমু দিলেন।’’ -তিরমিযী, যঈফ, অধ্যায়ঃ ৪০, সম্মতি প্রার্থনা, অনুচ্ছেদঃ ৩২, কোলাকুলি ও চুম্বন করা, হাদিস # ২৭৩২।
এই হাদিসটি যঈফ। কারণ, সানাদের মধ্যে বর্ণনাকারী ‘মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক্ব’ রয়েছে। আর তিনি হচ্ছেন প্রসিদ্ধ মুদালিস্নস অর্থাৎ তিনি রাবী’র দোষ গোপন করে হাদিস বর্ণনা করে থাকেন (মিযানুল ই’তিদ্বাল)। যে কারণে হাদিসটি যঈফ।
৭. মুজত্বরিবঃ যে হাদিসের রাবী স্বহীহ্ সানাদের বিপরীতমূখী বক্তব্য দিয়েছে, অথচ দু’টি বর্ণনাকে কোনভাবেই সমন্বয় করা সম্ভব নয় এমন হাদিসকে মুজত্বরিব হাদিস বলা হয়। এ সকল হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। হাদিস মুজত্বরিব হওয়ার জন্য দু’টি শর্ত রয়েছে-
(ক) এরূপ বিভিন্ন সানাদে হাদিস বর্ণিত হওয়া যার মধ্যে সমন্বয় সাধন অসম্ভব।
(খ) বর্ণনাগুলো মানগত দিক দিয়ে সমমর্যাদা সম্পন্ন। দু’টি বর্ণনার কোন একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দেয়া সম্ভব নয়।
মুজত্বরিব হাদিস দুই ভাগে বিভক্তঃ
ক. মুজত্বরিবুল মাতান,
খ. মুজত্বরিবুস্ সানাদ।
মুজত্বরিবুল মাতানঃ যে হাদিসের মূল বক্তব্যে ইজত্বরিব ঘটে।
ফাতিমা বিনতে ক্বায়েস (রা.) সূত্রে বর্ণিত,
‘‘তিনি নাবী (দ.) কে বলতে শুনেছেন যাকাত ছাড়া সম্পদে অন্য কোন হাক্ব নেই।’’-ইবনে মাজাহ্, যঈফ, অধ্যায়ঃ ৮, কিতাবুয্ যাকাত, অনুচ্ছেদঃ ৩, যে মালের যাকাত আদায় করা হয় তা পুঞ্জিভুত সম্পদ নয়, হাদিস # ১৭৮৯।
এই হাদিসটি মুজত্বরিব। কারণ অন্য জায়গায় একই রাবী হতে বর্ণিত হাদিসটি বিপরীত রয়েছে। ‘‘ফাতিমা বিনতে ক্বায়েস (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,
যাকাত সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (দ.) কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সম্পদের মধ্যে যাকাত ছাড়াও নিশ্চয়ই গরীবদের অধিকার রয়েছে।’’ -তিরমিযী, যঈফ, অধ্যায়ঃ ৫, কিতাবুয্ যাকাত, অনুচ্ছেদঃ ২৭, যাকাত ছাড়াও সম্পদে আরো প্রাপ্য আছে, হাদিস # ৬৫৯ ও ৬৬০।
এই দু’টি হাদিসের মাঝে কোনোভাবেই সমন্বয় করা সম্ভব নয়। যেহেতু দু’টি হাদিস থেকে কোনো সিদ্ধান্তেই আসা সম্ভব হচ্ছে না, তাই এই দু’টি হাদিস গ্রহণ করা যাচ্ছে না।
৮. মুদরজঃ যে হাদিসের মধ্যে রাবী নিজের অথবা অপরের উক্তিকে অনুপ্রবেশ করিয়েছেন, সে হাদিসকে মুদরজ হাদিস বলা হয় এবং এরূপ করাকে ইদরজ বলা হয়। এসকল হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন- হাসান (রহ.) হতে বর্ণিত,
‘‘একদা সামুরা বিন জুনদুব ও ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) পরস্পর আলোচনা প্রসঙ্গে সামুরা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রসূলুল্লাহ্ (দ.) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (দ.) থেকে স্বলাতের দু’স্থানে চুপ (দু’ সাকতা) সম্পর্কিত কথা মনে রেখেছি। প্রথম চুপ থাকার স্থান (সাকতা করার স্থান) হল ইমাম তাকবীরে তাহরীমার বলার পর থেকে ক্বিরাত শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত। আর দ্বিতীয় সাকতা হচ্ছে ‘‘গইরিল মাগ্বদ্বূবি আলাইহিম ওয়ালাদ্-দ্বালস্নীন’’ বলার পর…’’ -আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ ২, কিতাবুস্ সলাত, অনুচ্ছেদঃ ১২৩, স্বলাতের শুরুতে চুপ থাকা, হাদিস # ৭৭৯।
উল্লিখিত হাদিসটির কিছু অংশ মুদরজ। কারণ, ইমামের সূরাহ্ ফাতিহা পাঠ করার পর সাকতা করার কথাটি ‘‘সানাদের অন্যতম রাবী’’ কাতাদাহ্ (রহ.) এর কথা যা সামুরা বিন জুনদুব (রা.) এর কথা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ধরণের হাদিসকে মুদরজ (অর্থাৎ একজনের কথা আরেকজনের সাথে জুড়ে দেয়া) বলা হয় । এটা যে আসলেই কাতাদাহ্ (রহ.) এর কথা তা বুঝতে নিম্নোক্ত হাদিসটি লক্ষ্য করুন,
সামুরা বিন জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত,
‘‘তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ্ (দ.) থেকে চুপ থাকার (সাক্তা করার) দু’টি স্থান মনে রেখেছি। ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) তা অস্বীকার করেন। আমরা এ বিষয়টি মাদীনাতে ওবাই ইবনু কা’ব (রা.) কে লিখে জানালাম। তিনি (ওবাই ইবনু কা’ব রা.) সামুরা বিন জুনদুব (রা.) বিষয়টি মনে রেখেছেন। সাঈদ (রহ.) বলেন, আমি কাতাদাহ্ (রহ.) কে জিজ্ঞেস করলাম, সেই চুপ থাকার (সাকতা করার) স্থান দু’টি কি কি? কাতাদাহ্ (রহ.) বলেন, যখন তিনি (দ.) তাঁর স্বলাত শুরু করতেন এবং যখন ক্বিরাত পাঠ শেষ করতেন। অতঃপর তিনি বলেন, যখন ‘‘গইরিল মাগ্বদ্বূবি আলাইহিম ওয়ালাদ্-দ্বালস্নীন’’ পাঠ করা শেষ করতেন…।’’ -ইবনু মাজাহ্, অধ্যায়ঃ ৫, কিতাবু ইক্বামাতিস্ স্বলাহ্, অনুচ্ছেদঃ ১২, ইমামের জন্য দু’টি সাকতা, হাদিস # ৮৪৪।
এই হাদিসটি থেকে বুঝা যায়, সূরাহ্ ফাতিহা পাঠ করার পর ইমামের চুপ থাকা বা সাকতা করার কথাটি সামুরা বিন জুনদুব (রা.) এর নয়, বরং কাতাদাহ্ (রহ.) এর কথা, যা কি’না সামুরাহ্ বিন জুনদুব (রা.) এর কথা বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। যে কারণে, হাদিসটি যঈফ। এ ধরণের হাদিস উসূলুল হাদিস অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।
৯. মুদালঃ যে হাদিসের মাঝে দুই বা ততোধিক রাবীর বিলুপ্তি ঘটেছে এমন হাদিসকে মুদাল হাদিস বলা হয়। এই ধরণের হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন- ‘‘ইমাম মালিক (রহ.) আবু হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণনা করেন,
‘‘রসূলুল্লাহ্ (দ.) বলেছেন, দাস-দাসিকে ঠিকমতো খাদ্য ও পোশাক দিতে হবে। তাহার দ্বারা এমন কাজ নেয়া যাবে না, যাহা তার ক্ষমতার বহির্ভূত।’’ -মুয়াত্তা মালিক, যঈফ, অধ্যায়ঃ ৫৪, ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি গ্রহণ করার বিষয়, অনুচ্ছেদঃ ১৬, দাস-দাসীর সহিত নম্র ব্যবহার, হাদিস # ৪০।
এই রেওয়ায়েতটি মালিক থেকে মুদাল হয়েছে। এই রেওয়ায়েতটি মুদাল হওয়ার কারণ হচ্ছে ইমাম মালিক স্বহাবী আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে হাদিস শোনা সম্ভব নয়। মাঝখানে দুইজন রাবী (বর্ণনাকারী) বাদ পড়েছে। এ জন্যই হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়।
১০. শাযঃ যে হাদিসটি কোন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি তাঁরই মত অন্য গ্রহণযোগ্য এক বা একাধিক ব্যক্তির বিরোধীতা করে বর্ণনা করেছে সে হাদিসকে শায হাদিস বলা হয়। এই ধরণের হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। আলকামাহ্ (রহ) ওয়াইল (রা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করতেন,
‘‘নিশ্চয়ই তিনি শুনেছেন ওয়াইল (রা.) থেকে। তিনি (রা.) রসূলুল্লাহ্ (দ.) এর সাথে স্বলাত আদায় করেছেন। যখন তিনি (দ.) ‘গইরিল মাগদ্বূবী আলাইহীম ওয়ালাদ্ দ্বালস্নীন’ পড়েছেন তখনই আমিন নিচুশব্দে বলেছেন।’’ -বায়হাক্বী (সুনানুল কুবরা), যঈফ, অধ্যায়ঃ কিতাবুস্ স্বলাহ্, অনুচ্ছেদঃ ১৬২, ইমামের জোরে আমীন বলা, হাদিস # ২৪৪৭।
এই হাদিসটি শা’য হওয়ার কারণ হচ্ছে, অন্যান্য বর্ণনাকারীগণ বলেছেন ওয়াইল (রা.) রসূলুল্লাহ্ (দ.) থেকে জোরে আমীন বলার হাদিস বর্ণনা করেছেন। প্রমাণিত হয় যে, রসূলুল্লাহ্ (দ.) জোরে আমীন বলতেন। হাদিসটি লক্ষ্য করুন, ওয়াইল বিন হুজর (রা.) হতে বর্ণিত,
‘‘তিনি রসূলুল্লাহ্ (দ.) এর পেছনে স্বলাত আদায় করেছেন তাতে তিনি (দ.) স্বশব্দে আমীন বলেছেন…’’ -আবু দাউদ, স্বহীহ্, অধ্যায়ঃ ২, কিতাবুস্ স্বলাহ্ অনুচ্ছেদঃ ১৭২, ইমামের পেছনে আমীন বলা, হাদিস # ৯৩৩, দারিমী, স্বহীহ্, অধ্যায়ঃ ২, কিতাবুস্ সলাহ্, অনুচ্ছেদঃ ৩৯, জোরে আমীন বলা, হাদিস # ১২৪৭ (হাদিসটি আবু দাউদের বর্ণনা)।
এখন আমরা ওয়াইল (রা.) এর বর্ণিত কোন হাদিসটির উপর আ’মাল করব? রসূলুল্লাহ্ (দ.) কি জোরে আমীন বলতেন না’কি নীরবে আমীন বলতেন? যেহেতু অধিকাংশ বর্ণনাকারী বলেছেন, ওয়াইল (রা.) রসূলুল্লাহ্ (দ.) থেকে জোরে আমীনের হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে, ওয়াইল (রা.) আসলেই জোরে আমীনের হাদিসই বর্ণনা করেছেন, নীরবে আমিন বলার হাদিস বর্ণনা করেননি। কারণ, অধিকাংশ রাবী (বর্ণনাকারী) স্বাক্ষ্যর ক্ষেত্রে ভুল বর্ণনা করা সম্ভব নয়, বরং কম সংখ্যক রাবীই ভুল বর্ণনা করবে, যুক্তিও তাই বলে। আরও বুঝতে হবে যে, ‘‘ওয়াইল (রা.) এর বর্ণিত যে হাদিসে নীরবে আমীন বলতে বলা হচ্ছে সেই হাদিসে শু’বাহ্ নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন মূলতঃ এই শু’বাহ্-ই ভূল করে নীরবে আমীন বলতে হবে এই কথাটি বর্ণনা করেছেন ওয়াইল (রা.) নয়’’ এই কথাটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছে, (তিরমিযী, অধ্যায়ঃ ২, কিতাবুস্ স্বলাহ্, অনুচ্ছেদ্দঃ ৭২, আমীন বলা সম্পর্কে)। তাই হাদিসটি শায বলে পরিগণিত হচ্ছে। আর ‪#‎ শায‬হাদিস উসূলুল হাদিস (হাদিসের মূলনীতি) অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।
১১. মুআল্লাকঃ যে হাদিসের সানাদের শুরুতে একজন বা একাধিক বর্ণনাকারীর নাম উলেস্নখ করা হয়নি সে হাদিসকে মুআল্লাক হাদিস বলা হয়। অর্থাৎ সানাদের সকল বর্ণনাকারীদের নাম উল্লেখ না করে এরূপ বলা যে, রসূলুল্লাহ্ (দ.) বলেছেন অথবা স্বহাবী বা তাবেয়ী ছাড়া আর কারো নাম উল্লেখ না করা। এই ধরণের হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়।

Advertisements
Categories: Uncategorized | Leave a comment

Post navigation

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Create a free website or blog at WordPress.com.

%d bloggers like this: