অনেকে এমন কিছু হাদীস বর্ণনা করে যা হাদীসের গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায় না .

সুন্নাতের দাবীদার পথভ্রষ্টরা আল্লাহর গুণাবলী বিষয়ে এমন কিছু হাদীস বর্ণনা করে যা ইসলামের স্বর্ণ যুগে সংকলিত হাদীসের গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায় না। আমরা সুদৃঢ় প্রত্যয়ে বিশ্বাস করি যে, তা মিথ্যা ও অপবাদ। এমন কি এটি নিকৃষ্টতম কুফরী কর্ম। তারা এমন কিছু কথা বলে যার ভিত্তিতে কোন হাদীস পাওয়া যায় না বরং তা কুফরী কর্মের অন্তর্ভূক্ত । নিম্নে তাদের বর্ণিত কিছু ডাহা মিথ্যা হাদীস বিধৃত হলঃ
أن الله ينزل عشية عرفة على جمل أورق يصافح الركبان ويعانق المشاة”
নিশ্চয় আল্লাহ আরাফার দিনের সন্ধ্যা বেলা মাঠে উটের উপর সওয়ারী হয়ে আরাফায় অবতরণ করেন। আরোহণকারীদের সঙ্গে মুসাফা ও পদ ব্রজে চলমান ব্যক্তিদের সাথে কোলাকুলি করেন।’’ এটি আল্লাহ ও তদীয় রসূল (সাঃ) এর উপর বড় ধরনের মিথ্যা কথা ও অপবাদ। আল্লাহর প্রতি অপবাদকারীদের মধ্যে তারাই হলো শীর্ষে। মুসলিমদের কেউ এ ধরনের হাদীস বর্ণনা করেননি। বরং মুসলিম হাদীস বিজ্ঞানী ও সর্ব শ্রেণীর আলীমদের মতৈক্য অনুযায়ী এটি রসূলের উপর একটি মিথ্যাচার। আর হাদীস যে ইসলামী শরীয়তের উৎস তা বাতিল করার গভীর ষড়যন্ত্রে তারা জাল হাদীস তৈরী করেছে। এরূপ আরেকটি হাদীস হলো ঃ
“أنه رأى ربه حين أفاض من مزدلفة يمشي أمام الحجيج وعليه جبة صوف”
‘‘মুযদালিফা থেকে যখন রসূল (সাঃ) প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তখন তিনি আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছেন যে, তিনি হজব্রতকারীদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এবং তার গায়ে ছিল পশমী পাঞ্জাবী’’।
এরূপ বহু অপবাদ ও মিথ্যাচার তারা আল্লাহ ও রসূলের উপর আরোপ করেছে। এরা আল্লাহকে  জানে না। কারণ আল্লাহকে যারা নুন্যতমও জানে তারা এরূপ ডাহা মিথ্যা কথা আল্লাহর উপর বলতে পারে না। অনুরূপ আরেকটি হাদীস হলো ঃ
“أن الله يمشي على الأرض فإذا كان موضع خضرة قالوا هذا موضع قدميه”
নিশ্চয় আল্লাহ পৃথিবীতে চলাচল করেন। যখন সবুজ স্থানে যান তখন তারা বলেন এটা আল্লাহর দু’পা রাখার স্থান। এ মর্মে নিম্ন আয়াতটি তারা দলিল বলে পেশ করে থাকেন। আয়াতটি হলোঃ 
﴿فَانْظُرْ إِلَى آثَارِ رَحْمَتِ اللهِ كَيْفَ يُحْيِي الأَ
আল্লাহর অনুগ্রহের ফল সম্পর্কে চিন্তা কর, কিভাবে তিনি ভূমির মৃত্যুর পর একে পূনর্জীবিত করেন (রুম ৩০ঃ ৫০)।
আলিম সমাজের ঐক্যমত অনুযায়ী এ প্রসঙ্গে এ দলিল প্রমাণ করাও মিথ্যা। কারণ, আল্লাহ এ কথা বলেননি যে, তোমরা আল্লাহর পদক্ষেপের ফল সমূহের প্রতি চিন্তা ভাবনা কর। বরং তিনি বলেছেন
“آثار رحمت الله”
আল্লাহর রহমতের ফল সম্পর্কে। এখানে রহমত অর্থ হলো বৃষ্টি। আর ফল অর্থ হলো উদ্ভিজ্জ শস্য ও সবুজ তৃণলতা। তাদের বানানো হাদীসের আরো অংশ হলোঃ
“أن محمدا সাঃ رأي ربه في الطواف”
‘‘মুহাম্মদ (সাঃ) তার ‘রব’-কে ত্বওয়াফে দেখেছেন’’
“أنه رآه خارج من مكة”
তিনি মক্কার বাহিরে তাকে দেখেছেন, মদীনার কোন কোন গলিতে তাকে দেখেছেন। এরূপ বহু বানোয়াট হাদীস, যা বইয়ের কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় ছেড়ে দিলাম। 
তবে জেনে রাখা ভাল যত হাদীসে রসূল (সাঃ) স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছেন বলে বর্ণিত হয়েছে তা মুসলিম জাতির ঐক্যমতে ও আলিম সমাজের মতৈক্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ মর্মে কোন হাদীস মুসলিম মনীষীদের কেউই বর্ণনা করেননি। তবে মিরাজে রসূল (সাঃ) আল্লাহকে দেখেছেন কি না এ মর্মে সাহাবাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা যায়। ইবনে আব্বাস সহ আহলে সুন্নাতের বহু আলিম বলেছেন, রসূল (সাঃ) মিরাজে আল্লাহকে দেখেছেন। পক্ষান্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) সহ একটি দল পূর্বোক্ত অভিমত অস্বীকার করেছেন। তবে এ বিষয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) রসূল (সাঃ) থেকে কোন হাদীস বর্ণনা করেননি এবং এ প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসাও কেউ করেননি। এ বিষয়ে কতিপয় মুর্খরা হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (রাঃ) কর্তৃক যে হাদীসটি বর্ণনা করে যে তিনি আল্লাহর রসূলকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি মিরাজে আল্লাহকে দেখেছেন, তিনি জবাবে বললেন হ্যাঁ, দেখেছি। অপর দিকে হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে বলেছেন, আমি দেখিনি।’’ আলিম সমাজের ঐক্যমতে এই হাদীসও মিথ্যা। এ ধরনের কোন হাদীস বর্ণিত হয়নি। এ জন্যে ইমাম কাজী আবু ইয়া’লা সহ অনেকে ইমাম আহমদ কর্তৃক তিনটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন।
(ক) মুহাম্মদ (সাঃ) বিবেক প্রসূতভাবে আল্লাহকে দেখেছেন, 
(খ) কাল্পনিকভাবে দেখেছেন অথবা 
(গ) প্রকৃত ভাবেই দেখেছেন। 
অনুরূপ ভাবে পন্ডিতগণ হযরত ইবনে আব্বাস ও উম্মে তুফাইলসহ অনেকের থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
“رأيت ربي في صورة كذا وكذا”
‘‘আমি আমার রবকে এই রূপ এই রূপ আকৃতিতে দেখছি’’ সে হাদীসে রয়েছে
“أنه وضع يده بين كتفي حتى وجدت برد أنامله على صدري”
তিনি আমার দুই কাধের উপর তার হাত রাখলেন এমন কি তার আঙ্গুল সমূহের শীতলতা আমার বক্ষদেশে অনুভব করলাম। এই হাদীস মিরাজের রজনীর হাদীস নয়। এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল মদীনায়। কারণ হাদীসে এ পরিভাষা রয়েছে, রসূল (সাঃ) একদা ফজরের সলাতে বাধা গ্রস্ত হলেন। তারপর সাহাবাদের নিকটে গিয়ে বললেন, আমি আল্লাহকে এ রূপ এ রূপ দেখলাম। অন্য বর্ণনায় এসেছে এ সময় মদীনায় রসূলের পিছনে উম্মে তুফাইল মুয়াযসহ অনেকে সলাত আদায় করেছেন। আর পবিত্র কুরআন, মুতাওয়াতির হাদীস ও আলিমদের ঐক্যমত অনুসারে মিরাজ সংঘটিত হয়েছে মক্কায়। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ বলেন,
﴿سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى﴾ (الإسراء:১)
পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তার বান্দাকে কোন এক রজনীতে ভ্রমণ করিয়ে ছিলেন মাসজিদুল হারাম হতে মাসজিদুল আকসায়। (বনী ইসরাইল ঃ ১)
দীর্ঘ আলোচনায় প্রতিয়মান হয় যে, আল্লাহকে দেখার হাদীসটি ঘুমের মধ্যে সংঘঠিত হয়েছে। অসংখ্য মুফাস্সির বিবিধ সূত্রে এ হাদীসের প্রমাণ করেছেন। নবীদের স্বপ্নও ওহী। অতএব মিরাজের রাতে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখার হাদীস ঠিক নয়। 
মুসলিমগণ একমত যে, নবী (সাঃ) পৃথিবীতে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেননি। রসূল (সাঃ) কর্তৃক কখনই কোন হাদীসে এরূপ পরিভাষা আসেনি যে, আল্লাহ পৃথিবীতে অবতরণ করেন। বরং প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীস সমূহে এসেছে
“أن الله ينزل إلى سماء الدنيا كل ليلة حين يبقى ثلث الليل الآخر فيقول من يدعوني فأستجيب له، من يسألني فأعطيه، من يستغفرني فأغفر له”
রাতের শেষের তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে প্রতি রাতে আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আসমানে এসে বলেন, যে আমার নিকট প্রার্থনা করবে আমি তার প্রার্থনা কবুল করব। যে আমার নিকট কিছু চাইবে আমি তাকে তা দিয়ে দিব। আমার নিকট যে ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করে দিব(বুখারী, তাহাজ্জুদ অধ্যায় ।)।
সহীহ হাদীসে এসেছে
“أن الله يدنو عشية عرفة”
আরাফার দিনে বিকাল বেলায় আল্লাহ নিকটবর্তী হন। অপর বর্ণনায় এসেছে
“إلى سماء الدنيا فيباهي الملائكة بأهل عرفة فيقول: انظروا إلى عبادي أتوني شعثا غبرا ما أراد هؤلاء”
পৃথিবীর নিকটতম আসমানে আসেন। তারপর আরাফাবাসীদের বিষয়ে
ফিরিস্তাদের সঙ্গে গর্ববোধ করেন। তাদেরকে বলেন, দেখ আমার বান্দারা এলোমেলো চুল, ধুলায় ধুসরিত অবস্থায় আমার নিকট এসেছে। তারা আমার নিকট কি প্রত্যাশা করে?
আরো বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ শা’বান মাসের পনের তারিখে অবতরণ করেন। যদিও হাদীসটি আমার নিকট সহীহ মনে হয়। কিন্তু হাদীস যাচাই বাছাইকারী মহা বিজ্ঞানীগণ হাদীসটির গ্রহণযোগ্যের বিষয়ে প্রশ্ন উঠিয়েছেন। অনুরূপ ভাবে কেউ কেউ বর্ণনা করেন, নবী করিম (সাঃ)  যখন হেরা গুহায় ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন, তখন একদা আল্লাহ আসমান যমীনের মাঝখানে একটি চেয়ারের উপর উপবিষ্ট হয়ে রসূলের সামনে প্রকাশিত হয়েছিলেন। আহলে ইলম এর ঐক্যমত মোতাবেক এই হাদীসটিও সম্পূর্ণ ভূল। বরং সহীহ হাদীস সমূহে এসেছে যখন হেরা গুহায় জিবরীল (আঃ) প্রথম বার রসূল (সাঃ)-কে বলেছিলেন,
“فقال له: اقرأ فقلت: لست بقارئ فأخذني وغطني حتى بلغ مني الجهد، ثم أرسلني فقال اقرأ فقلت: لست بقارئ فأخذني  وغطني حتى بلغ مني الجهد، ثم أرسلني فقال”
তুমি পড়! রসূল (সাঃ) বলেন আমি বলেছি, আমি পড়তে জানি না। তিনি আমাকে ধরে নেন এবং চাপ দিলেন যাতে আমি কষ্ট অনুভব করলাম। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলছেন, তুমি পড়, আমি বললাম, আমি পড়তে জানি না। তিনি আমাকে ধরে নেন এবং চাপ দিলেন যাতে আমি কষ্ট অনুভব করলাম। অতপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, বল
﴿اقْرأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ، خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ، اقْرأْ وَرَبُّكَ الأَكْرَمُ، الَّذِيْ عَلَّمَ بِالقَلَمِ، عَلَّمَ الإِنْسَانَ مَالَمْ يَعْلَمْ﴾ (العلق: ১-৫)
তুমি পড়! তোমার ‘রব’ এর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে আলাক (জমাট রক্ত) থেকে সৃষ্টি করেছেন। তুমি পড়! তোমার রব সম্মানিত। যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে এমন বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন যা তারা জানত না। (আলাক ৯৬ঃ ১-৫)। এটাই হলো নবী (সাঃ) এর উপর অবতীর্ণ প্রথম ওহী। তারপর রসূল (সাঃ) ওহী বিরতি সম্পর্কে বলেন,
“فبينما أنا أمشي إذ سمعت صوتاً فرفعت رأسي فإذا هو الملك الذي جاءني بحراء أراه جالسا على كرسي بين السماء والأرض”
আমি হেটে যাচ্ছিলাম হঠাৎ একটি শব্দ শুনতে পেলাম। আমি মাথা উত্তোলন করলাম। দেখলাম ঐ জিব্রীল ফেরেস্তা যিনি হেরা গুহায় এসেছিলেন। তাকে আসমান ও যমীনের মাঝে একটি চেয়ারের উপর উপবিষ্ট অবস্থায় দেখলাম। বুখারী-মুসলিমে হযরত জাবির (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে- রসূল (সাঃ) বলেন, আসমান ও জমীনের মাঝে উপবিষ্ট হেরা গুহায় আগত ফেরেস্তাই হলেন ইনি। তারপর তাকে দেখে তিনি যে ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছিলেন তা বর্ণনা করলেন। বহু বর্ণনায় এভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, উপবিষ্ট ছিলেন ফেরেস্তা জিব্রীল (আঃ)। 
সারকথা হলো, হাদীসে বর্ণিত রয়েছে যে, নবী (সাঃ) স্বচক্ষে পৃথিবীতে আল্লাহকে দেখেছেন, আল্লাহ পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন, আল্লাহর পদাংক সমূহ হলো জান্নাতের বাগিচা, আল্লাহ বায়তুল মুকাদ্দাস এর আঙ্গিনায় চলাচল করেছেন। এ সবই হলো আহলে হাদীস তথা হাদীস বিশারদগণ সহ সকল মুসলিমের ঐক্যমত অনুযায়ী মিথ্যা ও বাতিল। 
অনুরূপভাবে যে দাবী করবে যে, সে আল্লাহকে মৃত্যুর পূর্বে প্রকাশ্যে স্বচক্ষে দেখেছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইজমা অনুযায়ী তার দাবীও বাতিল। কারণ, সকল মুসলিম একমত যে, মৃত্যুর পূর্বে স্বচক্ষে আল্লাহকে দর্শন করা যাবে না। 
নাওয়াস বিন সাম’আন কর্তৃক মুসলিম শরীফে দাজ্জাল প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। রসূল (সাঃ)  বলেন,
“واعلموا أن أحدا منكم لن يرى ربه حتى يموت”
তোমরা জেনে রেখ, তোমাদের মধ্যে কেউই তার মৃত্যুর পূর্বে তার ‘রব’-কে দেখতে পাবে না। এ মর্মে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে যাতে রসুল (সাঃ) স্বীয় জাতিকে দাজ্জালের ফিৎনা বিষয়ে সর্তক করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, কেউই তার মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহকে দেখতে পাবে না। সুতরাং কেউ যেন দাজ্জালকে দেখে এ ধারণা না করে যে, তিনি আল্লাহ। তবে আল্লাহর পরিচয়ের বিষয়ে গভীর ঈমানদারদের মধ্যে এমন গুণ সন্নিবিশিত হওয়া যে, তাদের হৃদয়ের গভীর প্রত্যয়, দর্শন ও পর্যবেক্ষণের জন্যে হৃদয়ের চোখে আল্লাহর দর্শন লাভ মনে করার বহু স্তর রয়েছে। তার মধ্যে একটি অন্যতম স্তর হলো ইহসান। 
হাদীসে জিব্রীলে ইহসান সম্পর্কে রসূল (সাঃ)  বলেন,  জিব্রীল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন,
“الإحسان: أن تعبد الله كأنك تراه، فإن لم تكن تراه فإنه يراك”
ইহসান হলো তুমি এমন ভাবে ইবাদত করবে যাতে মনে হয় তুমি আল্লাহকে দেখছ। আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও তাহলে অবশ্যই মনে করবে আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। 
হ্যাঁ, মু‘মিনগণ জান্নাতে স্বচক্ষে আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। অনুরূপ এটি সংঘঠিত হবে কিয়ামতের মহা ময়দানে। এটি নবী (সাঃ) কর্তৃক অকাট্য হাদীস সমূহ দ্বারা সুপ্রমাণিত। রসূল (সাঃ) বলেন,
“إنكم سترون ربكم كما ترون الشمس في الظهيرة ليس دونها سحاب، وكما ترون القمر ليلة البدر صحوا ليس دونه سحاب”
নিশ্চয়ই তোমরা অতি তাড়াতাড়ি তোমাদের রবকে দেখতে পাবে যেমন মেঘ মুক্ত আকাশে দ্বি-প্রহরে সূর্য দেখতে পাও, যেমন মেঘ মুক্ত আকাশে পূর্ণিমার রাতে চন্দ্র দেখতে পাও(বুখারী  ৭৪৩৯ ও মুসলিম)। রসূল (সাঃ) আরো বলেন,
“إذا دخل أهل الجنةِ الجنةَ نادي منادِ يا أهل الجنة إن لكم عند الله موعدا يريد أن ينجزكموه، فيقولون: ما هو؟ ألم يبيض وجوهنا ويثقل موازيننا ويدخلنا الجنة ويُجِرنا من النار، فيكشف الحجاب فينظرون إليه فما أعطاهم شيئا أحب إليهم من النظر إليه، وهي الزيادة”
‘‘যখন জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তখন একজন আহ্বানকারী বলবেন, আল্লাহর সঙ্গে আপনাদের একটি প্রতিশ্র“তি আছে। তিনি তা আপনাদেরকে প্রদান করবেন। জান্নাতবাসীগণ বলবেন সেটি আবার কি! আমাদের চেহারা কি উজ্জ্বল হয়নি! আমাদের আমল নামা কি ভারী হয়নি! আমাদেরকে কি জান্নাত দেননি! এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি! এমতাবস্থায় আল্লাহর পর্দা উঠে যাবে। তারা তাকে দেখবে। এমনকি তাদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রিয় হবে আল্লাহর দর্শন লাভ। উপরোক্ত হাদীস সমূহ সহীহ হাদীস গ্রন্থাবলীতে বর্ণিত আছে। পূর্ববর্তী আলিম সমাজ ও ইমামগণ এ হাদীসগুলো গ্রহণ করেছেন। 
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত একমত যে, জাহমিয়া সম্প্রদায় ও তাদের অনুসারী মুতাযিলা, রাফিজিয়া ও অনুরূপ আক্বীদা পন্থী দলেরাই মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করেছে। এরাই আল্লাহর গুণাবলী, দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে জাল হাদীস তৈরী করেছে। এই নির্গুণবাদীরাই সৃষ্টজীবের মধ্যে নিকৃষ্টতম।
রসূল (সাঃ) এর বর্ণনা অনুযায়ী আখেরাতে আল্লাহর দর্শন লাভকে মিথ্যা মনে করা, চরম পন্থীদের দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার দাবীকে সত্য বলে মনে করা, এ দুটির মাঝামাঝি রয়েছে আল্লাহর দ্বীন। এ দুটি আক্বীদাই বাতিল। এসব লোকদের কারো কারো দাবী যে, সে পৃথিবীতে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছে। এরাও পূর্ববর্তী লোকদের ন্যায় পথভ্রষ্ট। যদি তারা কোন সৎপরায়ণ ব্যক্তি অথবা সীমা অতিক্রমকারী ব্যক্তি বা রাষ্ট্র প্রধান কিংবা অন্য কোন ধরণের মানুষের ব্যাপারে আল্লাহকে প্রকাশ্য দেখার কথা বর্ণনা করে তাহলে তাদের পথভ্রষ্টতাকে প্রসারিত করা হবে এবং তাদেরকে কাফির বলে আখ্যায়িত করা হবে। এভাবে ঐসব খ্রিস্টানগণও পথভ্রষ্ট করেছিল তার জাতিকে যখন তারা দাবী করেছিল যে, তারা আল্লাহকে ঈসা ইবনে মরিয়ামের আকৃতিতে দেখেছে। এরা হলো শেষ যামানার দাজ্জালের অনুচর পথভ্রষ্টকারী। দাজ্জাল মানুষকে বলবে আমি তোমাদের রব, সে আসমানকে নির্দেশ দিবে, অতঃপর বৃষ্টি প্রবাহিত হবে এবং জমিনকে নির্দেশ দিবে, অতঃপর সুজলা-সুফলা ফসল উৎপাদিত হবে। সে অনাবাদি জমিকে বলবে তোমার ভিতর প্রোথিত সম্পদ বের করে দাও সঙ্গে সঙ্গে জমি তা বের করে দিবে। এভাবে নবী (সাঃ) জাতিকে দাজ্জাল বিষয়ে সতর্ক করে গেছেন। রসুল (সাঃ) বলেন,
“ما من خلق آدم إلى يوم القيامة فتنة أعظم من الدجال”
আদম সৃষ্টি থেকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত এই সবুজ শস্য শ্যামল পৃথিবীতে যত লোম হর্ষক ঘটনার অবতারণা হবে তার মধ্যে দাজ্জালের ঘটনাই হবে সব চেয়ে বড় ফিৎনা। রসূল (সাঃ) আরো বলেন,
“إذا جلس أحدكم في الصلاة فليستعذ بالله من أربع، ليقل: اللهم إني أعوذبك من عذاب جهنم، وأعوذبك من عذاب القبر، وأعوذبك من فتنة المحيا والممات، وأعوذبك من فتنة المسيح الدجال”
তোমাদের মধ্যে কেউ যখন সলাতের সমাপনী বৈঠকে বসে তখন সে যেন চারটি বিষয় হতে মুক্তির জন্যে আশ্রয় চেয়ে বলে, হে আল্লাহ! আমি জাহান্নামের আযাব থেকে তোমার নিকট আশ্রয় কামনা করছি, কবরের সাজা হতে নিস্কৃতির জন্যে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, জীবন ও মরণের পরীক্ষার বিষয়ে আশ্রয় চাচ্ছি এবং মাসীহ দাজ্জালের পরীক্ষা হতে বাঁচার জন্যে তোমার দরবারে আশ্রয় ভিক্ষা করছি। 
এ দাজ্জাল রুবুরিয়্যাহ দাবী করবে এবং কিছু সংশয় বিষয় দিয়ে মানুষকে পরীক্ষায় ফেলবে। এ কারণে আল্লাহ ও আল্লাহর দাবীদার দাজ্জালের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে রসূল (সাঃ) বলেছেন,
“إنه أعور، وإن ربكم ليس بأعور”
জেনে রাখ! দাজ্জাল হবে কানা, আর তোমাদের আল্লাহ কানা নন। তিনি আরো বলেছেন, তোমরা ভালভাবে জেনে রেখ! তোমাদের মধ্যে কেউই কখনই মৃত্যুর পূর্বে তার আল্লাহকে দেখতে পাবে না। উম্মতের জন্যে উপরোক্ত দুটি প্রকাশ্য  আলামত রসূল (সাঃ) বর্ণনা করেছেন। মানুষ সে দুটি চিহ্নের মাধ্যমে মিথ্যা আল্লাহ দাবীদার দাজ্জালকে সনাক্ত করতে সক্ষম হবে। কারণ দাজ্জালের পরীক্ষায় যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা মানুষের সামনে এ অবিচার করবে যে, সে মানুষের আকৃতিতে আল্লাহকে দেখেছে। যেমন করে বর্তমান বিভ্রান্তকারীরা আল্লাহকে দুনিয়াতে দেখার আক্বীদা রাখে। সেই পথভ্রষ্টদের নাম হলো সর্বেশ্বরবাদী ও অদ্বৈতবাদী। তারা প্রধানত এ দুটি ভাগে বিভক্ত। এ প্রকৃতির লোকেরা আল্লাহকে কতিপয় বস্তুর মধ্যে সর্বেশ্বর ও অদ্বৈতবাদ মনে করে। 
যেমন খ্রিস্টানগণ ঈসা (আঃ) এর মধ্যে ও চরম পন্থীরা আলী ও সমমান লোকদের মধ্যে আল্লাহর উপস্থিতি মনে করে। অপর কিছু লোক পীর, দরবেশ, হুজুর, শাইখদের মধ্যে আল্লাহ আছে বলে বিশ্বাস করে। অন্য কিছু লোক ভাবে রাজা বাদশাদের মধ্যে আল্লাহ লুকিয়ে থাকেন। আর কিছু খ্রিস্টানদের আক্বীদার চেয়েও নিকৃষ্টতম, যেমন এক শ্রেণী সর্বেশ্বরবাদী ও অদ্বৈতবাদীরা সকল অস্তিত্বের মধ্যে আল্লাহ বিরাজমান বলে মনে করে। এমনকি তারা বিশ্বাস করে কুকুর, শুকুর অপবিত্র বস্তুসহ আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। এটি জাহমিয়া সম্প্রদায় ও তাদের মতালম্বী এবং অদ্বৈতবাদী ইবনে আরাবী, ইবনে ফারিজ, ইবনে সাবঈন, তিলমসানীও বালয়ানী প্রমুখের বিশ্বাস। 
সকল রসূল, তাদের অনুসারী মু‘মিন ও আহলে কিতাব-এর মাযহাব হলো আল্লাহ তায়ালা সমগ্র বিশ্বের রব বা সার্বভৌম, আসমান ও যমীন এবং তার মধ্যকার সব কিছুর স্রষ্টা, মহাআরশের রব, সকল সৃষ্টি তারই। তারা তার প্রতি মুখাপেক্ষী। মহা মহিম পবিত্র আল্লাহ আসমানের আরশের উপর অধিষ্ঠিত। সৃষ্ট জীব থেকে আল্লাহ সম্পূর্ণ আলাদা এবং তিনি তার গভীর জ্ঞান, সীমাহীন শক্তি ও তুলনাহীন পরিচালনা ক্ষমতার গুণে সবার সঙ্গে রয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
﴿هُوَ الَّذِيْ خَلَقَ السَّمٰوَاتِ وَالأَ
তিনিই ছয় দিনে আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তার পর আরশে অধিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে ও আকাশে যা কিছু উঠে। তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর  আল্লাহ তা দেখেন (হাদীদ ৫৭ঃ-৪)। 
ঐসব কাফির পথভ্রষ্টরা দাবী করবে যে, তারা আল্লাহকে প্রকাশ্য দেখেছে অথবা এ দাবী করবে যে, তার সাথে বসেছে, কথা বলেছে, তার সঙ্গে সময় অতিবাহিত করেছে অথবা তিনি সবার সঙ্গে আছেন। এসকল দাবী যারাই করবে তারাই হবে সুস্পষ্ট দ্বীনচ্যুৎ অপরাধী। তাদেরকে উপরোক্ত আক্বীদা থেকে ফিরে আসার জন্যে তওবা করার জন্যে সুযোগ দিতে হবে। যদি তারা তওবা করে এবং ঐ ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে ফিরে আসে তাহলে ভাল, নতুবা ইসলামী আইনে আদালত কর্তৃক রায় অনুযায়ী তাকে হত্যা করতে হবে। আধুনিক কালের এ বিভ্রান্তকারীরা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের চেয়েও বড় কাফির। ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ কাফির এ জন্যে যে, তারা বলে মাসীহ ইবনে মরিয়ামই আল্লাহ। প্রকৃত পক্ষে মাসীহ হলো সম্মানিত রসূল। দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠদেরও অন্যতম। সুতরাং তারা যখন এ আক্বীদা পোষণ করে ‘ঈসা (আঃ)-ই আল্লাহ এবং আল্লাহ ও ঈসা (আঃ) একাকার হয়েছেন অথবা আল্লাহ ঈসা (আঃ) এর মধ্যে প্রবেশ করেছেন’। তখন তাদের কুফরী নিশ্চিত হয়েছে এবং তাদের কাফির হওয়া আরো সম্প্রসারিত হয়েছে। বস্তুতঃ তারা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তারা বলেছে আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। 
তাদের বিভ্রান্ত আক্বীদার ভাষাচিত্র আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াতে বলেন,
﴿وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمٰنُ وَلَدًا، لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِدًّا، تَكَادُ السَّمٰوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُّ الأَ
তারা বলে, ‘দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছে।’ তোমরা তো এক ভয়ানক বিষয়ের অবতারণা করেছ। এতে যেন আকাশ সমূহ ফেটে যাবে, পৃথিবী খন্ড বিখন্ড হবে ও পর্বতসমূহ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। কারণ তারা রহমানের উপর সন্তান আরোপ করে অথচ সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর জন্যে শোভা পায় না। আকাশ সমূহ ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে বান্দা রূপে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে না। (মারইয়াম ১৯:৮৮-৯৩)
অতএব সে লোকের কি হবে, যে সাধারণ মানুষের মধ্যে কাউকে আল্লাহ বলে দাবী করে? এটা কি চরমপন্থী খারিজী মতবাদের লোকদের চেয়ে বড় কুফরী নয়? কারণ তারা তো ইসলামী দুনিয়ার অন্যতম নক্ষত্র হযরত আলী (রাঃ) অথবা বিশ্ব নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর পরিবার ভুক্ত কাউকে আল্লাহ বলে দাবী করত। এ অপরাধে তারা দ্বীনচ্যুত হয়েছে, মুরতাদ হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) এদেরকে গ্রেফতার করেছেন। তিন দিন পর্যন্ত তাদেরকে সময় দিয়েছে তওবা করার জন্যে। যারা তওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরে এসেছে তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন। যারা তওবা না করে স্বীয় ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর অটল ছিল তাদের জন্য কিনদা দ্বারে গর্ত খোড়ার নির্দেশ প্রশাসনকে দিয়েছিলেন। নির্দেশ মোতাবেক গর্তখনন করে তার মধ্যে ঐ দ্বীনচ্যুতদেরকে রাখা হয়েছিল, তারপর তাদের উপর অবিরাম পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। সর্বশেষে গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদের হত্যার বিষয়ে সকল সাহাবী একমত ছিলেন। কিন্তু হত্যার ধরণ নিয়ে পরস্পর দ্বিমত ছিল। বিশিষ্ট সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর অভিমত ছিল আগুনে না পুড়িয়ে তলোয়ার দ্বারা হত্যা করা হোক। আর এটাই সকল আলিমের অভিমত। আর এটি আলিমদের নিকট একটি পরিচিত ঘটনা।

Advertisements
Categories: Uncategorized | Leave a comment

Post navigation

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Create a free website or blog at WordPress.com.

%d bloggers like this: